বাগেরহাটে মসজিদের উন্নয়নের নামে বরাদ্দ দেখিয়ে তিনটি ভুয়া প্রকল্পের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে একটি চক্রের বিরুদ্ধে। কাগজে-কলমে প্রকল্প থাকলেও বাস্তবে সেই মসজিদের অস্তিত্ব না থাকায় বিষয়টি নিয়ে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মতো সংবেদনশীল বিষয়কে ব্যবহার করে এ ধরনের অনিয়ম শুধু আর্থিক দুর্নীতিই নয়, বরং ধর্মীয় অনুভূতিতেও আঘাত হানে। তারা দ্রুত তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, মোরেলগঞ্জ উপজেলার দৈবজ্ঞহাটি ইউনিয়নের দক্ষিণ গাজীরঘাট মাতুব্বরবাড়ি জামে মসজিদ, যা স্থানীয়দের কাছে মাদারবুনিয়া জামে মসজিদ নামে পরিচিত।
এলাকার কিছু যুবক ও প্রবাসীদের সহায়তায় পুরনো জরাজীর্ণ ভবন ভেঙে নতুন মসজিদ নির্মাণ শুরু হলেও অর্থ সংকটে তা থেমে গেছে।
মসজিদের পাশে অস্থায়ী ছাপড়া তুলে সেখানে অতি কষ্টে নামাজ আদায় করছেন মুসল্লিরা। স্থানীয় মুসল্লি মাহবুব মাতব্বর, আব্দুর রহমান লিটন, মাসুদ মাতব্বর, নজরুল ইসলাম ও জাফর শেখ জানান, “আমরা নিজেরাই টাকা তুলে মসজিদের কাজ করছি। সরকারি কোনো অনুদান পাইনি। দীর্ঘদিন ধরে কাজ বন্ধ থাকায় কষ্টে নামাজ পড়তে হচ্ছে।”
মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি এমডি আরিফ হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক হাফিজুর রহমান ফকিরও একই অভিযোগ করে বলেন, “এই মসজিদের নামে কোনো সরকারি বরাদ্দ এসেছে, এমন তথ্য আমাদের জানা নেই। যদি বরাদ্দ হয়ে থাকে, তাহলে সেই টাকা কোথায় গেল তা তদন্ত হওয়া জরুরি।”
তবে বাগেরহাট জেলা পরিষদের নথিতে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। সেখানে মাদারবুনিয়া জামে মসজিদের উন্নয়নের জন্য ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেখানো হয়েছে। ২০২৫ সালের ২০ জুলাই পরিদর্শনের কথা উল্লেখ করে ইতোমধ্যে ১ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। নথিতে ঢালাই কাজের ভাউচার এবং কাজ সম্পন্নের ছবিও জমা দেয়া হয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের স্বাক্ষরের পর ফাইলটি বর্তমানে পরবর্তী কিস্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
এতেই শেষ নয়, একই ইউনিয়নের দক্ষিণ মাঝিরঘাট মুন্সিবাড়ি জামে মসজিদ এবং মাধববুনিয়া জামে মসজিদের নামেও পৃথক দুটি প্রকল্প দেখিয়ে অর্থ উত্তোলনের তথ্য পাওয়া গেছে। কিন্তু সরেজমিনে গিয়ে ওই নামে কোনো মসজিদের অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি।
এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য রুহুল আমিন মাতব্বর বলেন, “এই নামে কোনো মসজিদ এখানে নেই। এটি সম্পূর্ণ ভুয়া প্রকল্প বলে মনে হচ্ছে। সঠিক তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।”
জেলা পরিষদ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভুয়া প্রকল্পের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতকারী চক্রের মূলহোতা হিসেবে অভিযুক্ত মোরেলগঞ্জ উপজেলার গাজিরঘাট গ্রামের মোঃ মাকসুদুর রহমান ওরফে মামুন। তিনি ‘৭১ মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রাম পরিষদ, মেজর জিয়া জেড ফোর্স গেরিলা বাহিনী ও ২৪-এর জনতা বাহিনী’র বাগেরহাট জেলা কমিটির সদস্য।
এ বিষয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, সাবেক এক সচিবের মাধ্যমে তিনি এই বরাদ্ধ করিয়েছিলেন। স্থানীয়দের মাঝে বিষয়টি নিয়ে ভুল ধারনা রয়েছে। এই জেলা পরিষদ থেকে নেয়া এই অর্থ ফেরত দিবেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।”
এদিকে জেলা পরিষদের নবনিযুক্ত প্রশাসক ব্যারিস্টার শেখ মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, “অভিযোগটি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।”
মসজিদের মতো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নামে এ ধরনের অনিয়মে পুরো এলাকায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।







