০৭:২২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

খানজাহানের পুকুরের কুমিরের হামলায় মেয়েকে হারিয়ে তিন বছর পর পরিবারের কাছে ফিরলেন ফজিলা

একদিকে আট বছরের শিশু কন্যা ফাতেমাকে হারানোর অসহনীয় বেদনা, অন্যদিকে তিন বছর ধরে নিখোঁজ থাকা এক মাকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ। বাগেরহাটের ঐতিহাসিক খানজাহান আলী (রহ.) মাজারকে ঘিরে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ঘটনার মধ্যেই সামনে এসেছে এমন এক মানবিক গল্প, যা ছুঁয়ে গেছে অনেকের হৃদয়।

খানজাহান আলী (রহ.) মাজার সংলগ্ন দিঘিতে কুমিরের আক্রমণে নিহত শিশু ফাতেমার মা ফজিলা বেগমকে অবশেষে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ তিন বছর ধরে নিখোঁজ থাকা মানসিক ভারসাম্যহীন ফজিলার খোঁজ মিলেছে মেয়ের মৃত্যুর সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে।

জানা গেছে, ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চরখরিচা গ্রামের বাসিন্দা ফজিলা বেগম প্রায় তিন বছর আগে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। এরপর বহু খোঁজাখুঁজির পরও তার সন্ধান পায়নি পরিবার। একসময় সবাই ধরে নিয়েছিল হয়তো তিনি আর বেঁচে নেই। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, ফজিলার সন্ধান মিলল তার ছোট মেয়ে ফাতেমার মৃত্যুর খবরের সূত্র ধরে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ফজিলা বেগম প্রায় দুই বছর ধরে খানজাহান আলী (রহ.) মাজার এলাকায় বসবাস করছিলেন। তার সঙ্গে ছিল ছোট মেয়ে ফাতেমা। মাজারের আশপাশে ঘুরে বেড়ানো মা-মেয়েকে প্রায় সবাই চিনতেন। সামান্য খাবার বা সাহায্য পেলেই দুজন একে অপরকে খুঁজে নিতেন। তাদের ছোট্ট পৃথিবী ছিল মাজারের খোলা আকাশের নিচে।

কিন্তু গত সোমবার রাতে মাজার সংলগ্ন দিঘির মহিলা ঘাটে গোসল করতে নেমে কুমিরের আক্রমণের শিকার হয় ফাতেমা। পরে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাটি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে সেখানে থাকা ফজিলার ছবি ও পরিচয় দেখে পরিবারের সদস্যরা তাকে শনাক্ত করেন।

এরপর ফজিলার মা হাজেরা খাতুন, ভাই হারেছ আলী, ভাই জুয়েল মিয়া, ছেলে বজলুর রহমানসহ পরিবারের ছয় সদস্য বাগেরহাটে ছুটে আসেন। মাজারে এসে তারা ফজিলাকে শনাক্ত করেন এবং দীর্ঘদিন পর স্বজনকে ফিরে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

ফজিলার ছোট ভাই জুয়েল মিয়া বলেন, “তিন বছর আগে আমার বোন হারিয়ে গিয়েছিল। আমরা দেশের বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করেছি, আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে খোঁজ নিয়েছি, কিন্তু পাইনি। আজ বোনকে ফিরে পেয়েছি, এজন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া। কিন্তু ভাগ্নি ফাতেমাকে হারানোর কষ্ট কখনো ভুলতে পারব না। বোনকে পেলাম, কিন্তু ভাগ্নিকে হারিয়ে ফেললাম।”

ফজিলার বড় ভাই হারেছ আলী বলেন, “আমরা আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। হঠাৎ টেলিভিশন ও ফেসবুকে সংবাদ দেখে বোনকে চিনতে পারি। এরপর দ্রুত বাগেরহাটে আসি। বোনকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ আছে, কিন্তু যে ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাকে খুঁজে পেলাম, সেটা খুবই কষ্টের।”

ফজিলার ছেলে বজলুর রহমান বলেন, “ছোটবেলা থেকে মা আমাদের অনেক কষ্ট করে মানুষ করেছেন। তিন বছর ধরে মাকে খুঁজেছি। মাকে ফিরে পেয়েছি, কিন্তু আমার ছোট বোন ফাতেমা আর নেই। মাকে নিয়ে বাড়ি ফিরছি, কিন্তু ছোটবোন চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেছে।”

ফজিলার মা হাজেরা খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার মেয়েকে ফিরে পেয়েছি, এজন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া। কিন্তু আমার নাতনিটাকে আর ফিরে পাব না। যদি আমার নাতনিটাও বেঁচে থাকত, তাহলে আমার আনন্দ পূর্ণ হতো। আল্লাহ ওকে জান্নাত নসিব করুক।”

স্বজনদের ভাষ্য, ফজিলা এখনো পুরোপুরি বুঝতে পারছেন না তার মেয়ের মৃত্যুর বিষয়টি। তিনি খুব কম কথা বলছেন। তবে বারবার একটি কথাই বলার চেষ্টা করছেন “আমি আমার মেয়েকে রেখে যাব না।”

বাগেরহাট সদর উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ফজিলার পরিচয় যাচাই-বাছাই করা হয়। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পরীক্ষা এবং পরিবার শনাক্ত হওয়ার পর উপজেলা প্রশাসন, সমাজসেবা অধিদপ্তর, পুলিশ ও গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতিতে তাকে পরিবারের জিম্মায় হস্তান্তর করা হয়।

বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোসা. আতিয়া খাতুন বলেন, “পরিবারের সদস্যরা যোগাযোগ করার পর আমরা পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই করি। সমাজসেবা বিভাগ, পুলিশ ও সংশ্লিষ্টদের উপস্থিতিতে ফজিলা বেগমকে তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।”

একদিকে তিন বছর পর হারিয়ে যাওয়া মাকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ, অন্যদিকে ছোট্ট ফাতেমাকে হারানোর বেদনা এই দুই বিপরীত অনুভূতি নিয়েই ময়মনসিংহের পথে রওনা হয়েছে ফজিলার পরিবার। আর মাজার প্রাঙ্গণে ছুটে বেড়ানো সেই ছোট্ট ফাতেমা স্মৃতি হয়ে রয়ে যাবে স্থানীয়দের হৃদয়ে।

বিষয়

খানজাহানের পুকুরের কুমিরের হামলায় মেয়েকে হারিয়ে তিন বছর পর পরিবারের কাছে ফিরলেন ফজিলা